‘লেনিন-মার্কস-হো চি মিনের নাম মুছতে দেব না!’ পুজোর পরেই রাজ্যজুড়ে মেগা গণ-আন্দোলনের ডাক সেলিমের!

কলকাতা শহরের ঐতিহাসিক রাস্তার নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে এবার উত্তাল হয়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক মুক্তি আন্দোলন ও সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রাণপুরুষ—কার্ল মার্কস, ভি আই লেনিন এবং হো চি মিনের নামাঙ্কিত রাস্তার নাম পরিবর্তনের এই চেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে রাজ্যের সমস্ত বামপন্থী দলগুলি। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিকৃত বা মুছে ফেলার এই প্রশাসনিক উদ্যোগের বিরুদ্ধে সোমবার একজোট হয়ে সুর চড়ালেন বাম নেতৃত্ব।
স্থান বদল করেও সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে বামেদের অবস্থান বিক্ষোভ
সোমবার প্রথমে ধর্মতলায় অবস্থিত লেনিনের মূর্তির পাদদেশে এই অবস্থান বিক্ষোভের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে কলকাতা পুলিশের অনুমতি না মেলায় কর্মসূচির স্থান পরিবর্তন করা হয়। সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে আয়োজিত এই প্রতিবাদ সভায় সামিল হন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের শীর্ষনেতা অতনু চক্রবর্তী, ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায় এবং এসইউসিআই(সি)-র নেতা চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য সহ শীর্ষ বাম নেতৃত্ব।
“সরকার বদলালেই ইতিহাস বদলানো যায় না” – সেলিমের হুঙ্কার
অবস্থান মঞ্চ থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মারাত্মক আক্রমণাত্মক মেজাজে দেখা যায় সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে। তিনি বলেন:
“একটা সরকার পাল্টে গেলেই তারা আমাদের সমস্ত স্মৃতি ও সংস্কৃতি পাল্টে দেবে, এটা হতে পারে না। রাস্তার নাম পরিবর্তনের এই বিতর্ক আসলে মানুষের আসল সমস্যাগুলি থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার এক গভীর ষড়যন্ত্র।”
সেলিম আরও অভিযোগ করেন, রাজ্যে কর্মসংস্থান, বেহাল শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া, সরকারি শিক্ষার সংকট এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার চরম অনটন থেকে মানুষের মুখ ঘুরিয়ে রাখতেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, লেনিন, মার্কস বা হো চি মিনের নাম কোনও নিছক ভৌগোলিক রাস্তার নাম নয়; এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম এবং শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস।
ধর্মীয় মেরুকরণ ও পুলিশি বাধার তীব্র নিন্দা
সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের নেতা অতনু চক্রবর্তী অভিযোগ করেন যে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে তাঁদের অবস্থান কর্মসূচির অনুমতি বাতিল করে পুলিশ। কিন্তু নীতি ও আদর্শের লড়াই কোনো বাধা দিয়েই থামানো যাবে না।
বাম নেতাদের সম্মিলিত দাবি, নাম বদলের এই রাজনীতি আসলে রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতার নামে ইতিহাসকে মুছে দেওয়ার প্রয়াস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ কিংবা গৌতম বুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক মনীষীদের পাশাপাশি বিশ্বের প্রতিটি কোণের মুক্তিকামী চেতনাকে শ্রদ্ধা জানানোই বাংলার আসল বহুত্ববাদী ঐতিহ্য। আজ যদি এই নাম বদলকে মেনে নেওয়া হয়, তবে কাল মহাত্মা গান্ধী বা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ঐতিহাসিক অবদান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
দুর্গোৎসবের পরেই রাজ্যজুড়ে বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলনের রূপরেখা
বিক্ষোভ সভা থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই প্রতিবাদ কেবল কলকাতার কয়েকটি রাস্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আসন্ন দুর্গাপূজার উৎসব কাটলেই নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী এবং আপামর সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে এক বৃহত্তর কনভেনশন ও গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।