তেলের আগুন ও আমেরিকার শুল্কের খাঁড়া! চাঙ্গা অর্থনীতির মাঝে বড় ধাক্কা কি ভারতের সামনে?

দেশের অর্থনীতি এক দিকে শক্তিশালী গতিতে এগিয়ে চললেও বিশ্ব অর্থনীতির নানা নতুন চাপ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের দামের লাগামছাড়া বৃদ্ধি এবং আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ঘিরে তৈরি হওয়া তীব্র অনিশ্চয়তা ভারতের অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে। অর্থ মন্ত্রকের সাম্প্রতিক মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় এই দুটি বিষয়কে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় অপরিশোধিত তেলের ঝুড়ির গড় দাম সেপ্টেম্বরে হু হু করে বেড়ে প্রতি ব্যারেল দাঁড়িয়েছে ১১৬.০৪ ডলারে, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১১ হাজার ১৩৮ টাকা। যেখানে আগস্ট মাসে এই দাম ছিল ৯০.১৯ ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ৬৫৭ টাকা। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেলে দাম বেড়েছে ২৫.৮৫ ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৪৮১ টাকা। শতাংশের হিসেবে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ২৮.৬৬ শতাংশ। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারতীয় অপরিশোধিত তেলের দাম আরও কিছুটা বেড়ে ১১৬.৫২ ডলারে (প্রায় ১১ হাজার ১৮৪ টাকা) পৌঁছায়।

ভারত তার জ্বালানি প্রয়োজনের একটি বিরাট অংশ আমদানি করে থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উর্ধ্বমুখী থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পরিবহণ খাত, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, উৎপাদন এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক খরচে।

অর্থ মন্ত্রকের পর্যালোচনায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের চাপ এবং আবহাওয়াজনিত নানা অস্থিরতার কারণে খুচরো, পাইকারি এবং উৎপাদক—এই তিন স্তরেই মূল্যবৃদ্ধির চাপ লক্ষ্য করা গেছে। তবে আশার কথা হলো, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এখনও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত সীমার মধ্যেই রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রকৃত জিডিপির বৃদ্ধির হার ছিল শক্তিশালী ৭.৮ শতাংশ। একই সময়ে শিল্প ক্ষেত্রে প্রকৃত গ্রস ভ্যালু অ্যাডেড বেড়ে হয়েছে ৭.৭ শতাংশ এবং উৎপাদন শিল্পে বৃদ্ধির হার ছিল ৯.২ শতাংশ। পাশাপাশি, আর্থিক পরিষেবা, আবাসন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং পেশাদারি পরিষেবা মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অসাধারণ বৃদ্ধির হার রেকর্ড করা হয়েছে ১২.১ শতাংশ।

তেলের বাজারের এই অস্থিরতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতিও ভারতের জন্য নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশগুলির উপর আমেরিকার পক্ষ থেকে সম্ভাব্য উচ্চ শুল্ক আরোপের বিষয়টি সামগ্রিক বাণিজ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অর্থ মন্ত্রকের মতে, বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খল এখন ক্রমশ অর্থনৈতিক নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলির মধ্যে নতুন উৎপাদন প্রকল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতাও নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এতকিছুর পরেও ভারতের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে স্বস্তির ও ইতিবাচক দিক হলো নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা FDI। অর্থ মন্ত্রকের পর্যালোচনায় স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে যে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে নিট FDI গত বছরের তুলনায় অনেকটাই বাড়তে পারে। ফলে দেশের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, উৎপাদন খাতের গতি এবং বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি মূলধনের এই অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ ভারতীয় অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।