ইঁদুরের মতো চেহারা কিন্তু হরিণের মতো চঞ্চল! ভারতের গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা এই বিরল প্রাণীকে চেনেন?

ভারতের বন্যপ্রাণী জগতের বৈচিত্র্য সত্যিই বিস্ময়কর। দেখতে অবিকল ইঁদুরের মতো হলেও হরিণের মতো দ্রুত চলাফেরা করা এক অদ্ভুত ও বিরল প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান মিলেছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের গভীর অরণ্যে। বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের কাছে যা ‘ইঁদুর হরিণ’ বা ‘মাউস ডিয়ার’ নামে পরিচিত। সামান্যতম শব্দ পেলেই যা মুহূর্তের মধ্যে ঝোপঝাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রথম নজরে এই ক্ষুদ্র প্রাণীটিকে দেখলে যে কারও মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, কিন্তু এটি কোনো তীক্ষ্ণদন্তী ইঁদুর নয়, বরং এটি হরিণ পরিবারেরই একটি অত্যন্ত দুর্লভ ও প্রাচীন সদস্য। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানার বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও এই বিরল প্রাণীর অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা গেছে।

সাধারণত ‘মাউস ডিয়ার’ নামটি শুনলেই মানুষের মনে ইঁদুরের কথা ভেসে ওঠে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষেই এদের সঙ্গে ইঁদুরের কোনো শারীরিক বা জৈবিক সম্পর্ক নেই। এরা মূলত ‘ট্র্যাগুলিডি’ (Tragulidae) নামক স্তন্যপায়ী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ভারতে পাওয়া এই বিশেষ প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম ‘মোশিওলা ইন্ডিকা’ (Moschiola indica)। দেশের অন্যতম ক্ষুদ্রতম এই হরিণগুলির উচ্চতা মাত্র ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার এবং ওজন সাকুল্যে ৩ থেকে ৪ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। অন্যান্য সাধারণ হরিণের মতো এদের মাথায় কোনো শিং থাকে না। তবে এর পরিবর্তে পুরুষ মাউস ডিয়ারের উপরের চোয়ালে দুটি ধারালো ও বাইরের দিকে বেরিয়ে থাকা হিংস্র দাঁত দেখতে পাওয়া যায়। এদের পুরো শরীর গাঢ় বাদামী রঙের এবং দু’পাশে ছড়িয়ে থাকে সাদা রঙের ছোপ ও ডোরাকাটা দাগ। ছদ্মবেশ ধারণ করার এই প্রাকৃতিক গুণ এদের বনের শুকনো পাতা ও ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে দারুণভাবে সাহায্য করে।

স্বভাবের দিক থেকে মাউস ডিয়ার অত্যন্ত লাজুক ও চরম সতর্ক প্রকৃতির প্রাণী। এরা সচরাচর দিনের আলোয় বাইরে বের হয় না। দিনের বেলায় এরা গাছের কোটর, পাথরের ফাটল কিংবা বনের ঘন ঝোপের মধ্যে নিজেদের লুকিয়ে রাখে। একমাত্র রাতের অন্ধকারেই এরা খাদ্যের সন্ধানে জঙ্গল চষে বেড়ায়। বনাঞ্চলে সামান্যতম সাড়াবোর্ড বা পায়ের আওয়াজ পেলেই এরা বিদ্যুৎগতিতে পালিয়ে যায়। এই অতিরিক্ত সতর্কতার কারণেই গভীর জঙ্গলে অবাধে বসবাস করা সত্ত্বেও এদের সহজে চোখে পড়ে না। অন্ধ্রপ্রদেশের বিখ্যাত তিরুমালা-শেষাচলম বন এবং নাল্লামালা ও শ্রীশৈলম জঙ্গলে এদের উপস্থিতির বহু প্রমাণ মিলেছে। এমনকি তেলেঙ্গানার অমরাবাদ টাইগার রিজার্ভে এই বিরল প্রাণীদের সংরক্ষণ ও বংশবৃদ্ধির জন্য বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। হায়দ্রাবাদের নেহেরু চিড়িয়াখানায় কৃত্রিমভাবে প্রতিপালিত বেশ কিছু মাউস ডিয়ারকে ইতিমধ্যেই অমরাবাদের বনাঞ্চলে সফলভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে মুলুগু জেলার এতুরুনগরম অভয়ারণ্যের লিঙ্গালা বন এলাকাতেও ক্যামেরা ট্রাপে এই হরিণ ধরা পড়েছে।

আকারে অত্যন্ত ছোট ও নিরামিষভোজী হলেও, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মাউস ডিয়ার অত্যন্ত বিশেষ সুরক্ষা পেয়ে থাকে। ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের সর্বোচ্চ তালিকা অর্থাৎ ‘তফসিল ১’-এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এই প্রাণী। তাই এদের জখম করা, শিকার করা বা হত্যা করা একটি অত্যন্ত গুরুতর ও অমার্জনীয় অপরাধ। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN)-এর লাল তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে এদের ‘ন্যূনতম উদ্বেগজনক’ (Least Concern) হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, ক্রমহ্রাসমান বনভূমি এবং চোরাশিকারীদের অবৈধ তৎপরতা এদের টিকে থাকার লড়াইয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অথচ অনন্য প্রাণীদের সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।