‘প্রতিবেশী-প্রথম’ নীতিতে বিরাট মাস্টারস্ট্রোক! ৩ শতাধিক সেনার অংশগ্রহণে ভারত-মায়ানমারের ত্রিমুখী রণকৌশল

ভারত এবং মায়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা ও পারস্পরিক আস্থার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটিয়ে তামিলনাড়ুর চেন্নাইতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে প্রথম দ্বিপাক্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘রাহাত মিত্র’ (Rahat Mitra)। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা যে কোনো বড় ধরনের অপ্রত্যাশিত মানবিক সংকটের মুহূর্তে উভয় দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে যৌথভাবে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে পারে, তার প্রস্তুতি ও দক্ষতা যাচাই করতেই এই বিশাল আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই দিনব্যাপী আয়োজিত এই মেগা মহড়ায় ভারত ও মায়ানমার উভয়েরই সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর তিন শতাধিক তুখোড় সামরিক কর্মী অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন।
এই ঐতিহাসিক যৌথ মহড়ার পুরো পরিচালনার মূল দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে ভারতীয় নৌবাহিনীর ওপর। উভয় দেশের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই অনুশীলনের গুরুত্ব অপরিসীম। ভারত কিংবা মায়ানমারে যদি কখনো আকস্মিক বন্যা, প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প কিংবা বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসে, তবে উভয় দেশের সশস্ত্র বাহিনী যেন কোনো রকম সময় নষ্ট না করে যৌথভাবে নিখুঁত ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ দ্রুত রূপায়ণ করতে পারে, তা নিশ্চিত করাই এই মহড়ার প্রধান লক্ষ্য। অনুশীলনের চলাকালীন দুই দেশের সামরিক সদস্যরা দুর্যোগকালীন উদ্ধারকাজে নিজেদের বহুমুখী অভিজ্ঞতা ও আধুনিক কৌশল একে অপরের সঙ্গে আদান-প্রদান করছেন। এছাড়া যে কোনো সংকটজনক মুহূর্তে সশস্ত্র বাহিনীর তিনটি প্রধান শাখার মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমন্বয় কীভাবে আরও সুদৃঢ় করা যায়, তা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা চলছে।
‘মানবতার জন্য ঐক্যবদ্ধ, অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী’—এই মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখেই এগিয়ে চলেছে ‘রাহাত মিত্র’ মহড়া। এই আয়োজনের মাধ্যমে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে এবং যেকোনো প্রাকৃতিক বিপদের সময় যৌথভাবে আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই যৌথ অনুশীলনটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদি ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ (প্রতিবেশী-প্রথম) কূটনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই নীতিটি বরাবরই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও পারস্পরিক নিরাপত্তাকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে থাকে। পাশাপাশি, ভারতের সুদূরপ্রসারী ‘মহাসাগর’ (MAHASAGAR) দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও এই মহড়ার উদ্দেশ্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার মূল লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যাপক প্রসার ঘটানো।
ভারত এবং মায়ানমারের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরেই সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, তিন বাহিনীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রথম যৌথ মহড়াটিকে উভয় দেশের সামরিক সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা। এই মহড়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে একটি স্পষ্ট বার্তাও দেওয়া হচ্ছে যে, যেকোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা মানবিক সংকটের মুহূর্তে দুটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত সাহায্য পৌঁছে দিতে প্রস্তুত রয়েছে।