হক ১৩২-এর দিন শেষ? চালক তৈরিতে নয়া বিপ্লব আনছে বায়ুসেনা, আসছে অত্যাধুনিক স্টেজ-৩ জেট ট্রেইনার!

ভারতীয় বিমান বাহিনী (IAF) তাদের পাইলট প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও বেশি যুগোপযোগী, ধারালো ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এক মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা আপডেট অনুযায়ী, বায়ুসেনার পাইলটদের ভবিষ্যৎ যুদ্ধের কঠিন চ্যালেঞ্জের জন্য নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করতে নতুন ‘স্টেজ-৩ অ্যাডভান্সড জেট ট্রেনার’ বিমান সংগ্রহের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ইতিমধ্যে এই সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক ‘রিকোয়েস্ট ফর ইনফরমেশন’ বা আরএফআই (RFI) জারি করেছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই নতুন জেট ট্রেইনারগুলি বর্তমানের নির্ভরযোগ্য ‘হক ১৩২’ বিমানগুলিকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করবে না, বরং বিমানবহরের স্ট্র্যাটেজিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে একটি শক্তিশালী অতিরিক্ত বা অ্যাডিশনাল বহর হিসেবে যুক্ত হবে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের শেয়ার করা সময়সীমা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলিকে আগামী ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যেই এই বিশাল প্রকল্পের জন্য তাদের টেন্ডার বা দরপত্র জমা দিতে হবে। চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট ৬০ মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সমস্ত বিমান সরবরাহ করতে হবে বলে শর্ত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই ক্রয়ের জন্য মূল ‘রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল’ বা আরএফপি (RFP) জারি করা হতে পারে বলে জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এই মেগা প্রতিরক্ষা প্রতিযোগিতায় ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান নির্মাণ সংস্থা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড বা এইচএএল (HAL)-এর অংশগ্রহণ অত্যন্ত নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এইচএএল তাদের সর্বাধুনিক দেশীয় প্রযুক্তির ‘এইচএলএফটি-৪২’ (HLFT-42) অ্যাডভান্সড জেট ট্রেনার বিমান সামনে এনে এই প্রতিযোগিতায় নিজেদের জোরালো দাবি প্রতিষ্ঠা করবে। প্রায় ১৬.৫ টন ওজনের এই প্রজেক্টটি ভারতের গর্বের দেশীয় যুদ্ধবিমান ‘তেজাস’-এর উন্নত প্রযুক্তিগত নকশা দ্বারাই গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। বিশেষ সূত্রে খবর, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি বহুল প্রতীক্ষিত ‘অ্যারো ইন্ডিয়া ২০২৭’ প্রদর্শনীতে এই বিমানের একটি নজরকাড়া স্কেল মডেল জনসমক্ষে তুলে ধরার পরিকল্পনা করেছে।

শুধু দেশীয় জায়ান্টরাই নয়, এই অত্যন্ত লাভজনক প্রতিরক্ষা চুক্তির লড়াইয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক ডিফেন্স জায়ান্টও ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে বলে খবর। বিশ্ববাজারের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সামরিক বিমান প্রস্তুতকারক ইতালির ‘লিওনার্দো’ কোম্পানি তাদের পরীক্ষিত এবং অত্যন্ত সফল ‘এম-৩৪৬’ (M-346) প্রশিক্ষণ বিমানটি ভারতের সামনে প্রস্তাব করতে পারে। এই বিমানটি ইতিমধ্যেই ইতালি, সিঙ্গাপুর, ইসরায়েল, পোল্যান্ড, কাতার এবং গ্রিসের মতো একাধিক শক্তিশালী দেশের বিমান বাহিনীতে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রখ্যাত ‘কোরিয়া অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর ‘টি-৫০’ (T-50), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা জায়ান্ট বোয়িংয়ের ‘টি-৭এ’ (T-7A) এবং রাশিয়ার শক্তিশালী ‘ইয়াক-১৩০’ (Yak-130) বিমানগুলিও এই মেগা রেসে প্রবলভাবে জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে।

অবশ্যই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, বর্তমান বহরে হক ১৩২ থাকতে হঠাৎ এই নতুন স্টেজ-৩ জেট ট্রেইনারের প্রয়োজনীয়তা কেন অনুভূত হলো? প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় বিমান বাহিনী নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অত্যন্ত জটিল ও আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলির জন্য দক্ষ পাইলট তৈরি করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। বর্তমানের গর্বের দেশীয় ‘তেজাস এমকে-২’ এবং অদূর ভবিষ্যতে ভারতীয় আকাশে উড়তে চলা পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক স্টেলথ ফাইটার ‘এএমসিএ’ (AMCA)-এর ক্ষেত্রে কোনো দুই-আসনের প্রশিক্ষণ সংস্করণ বা টুইন-সিটার ট্রেইনার তৈরি করার কোনো পরিকল্পনা রাখা হয়নি। ফলে, এই হাই-টেক ও মারাত্মক মারকাটারি যুদ্ধবিমানগুলিতে পাইলটদের সরাসরি মোতায়েন করার আগে তাঁদের অত্যন্ত নিখুঁত ও উন্নত মানের কৌশলগত প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি বিশ্বমানের স্টেজ-৩ জেট ট্রেইনারের প্রয়োজনীয়তা চরম আকার ধারণ করেছিল। নতুন এই প্রজন্মের প্রশিক্ষণ বিমানগুলির ঐতিহাসিক আগমন আগামী দিনে ভারতীয় বিমান বাহিনীকে যেকোনো আধুনিক ও হাইব্রিড যুদ্ধের প্রযুক্তিগত ও উড্ডয়নগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য নিজেদের তরুণ পাইলটদের আরও অনেক বেশি নিখুঁত ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে অসামান্য সাহায্য করবে, যা প্রকারান্তরে দেশের সামগ্রিক সামরিক ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।