এফএসএল-এর ভুয়ো রিপোর্টে জেল খাটলেন মহিলা অফিসার! রাজস্থানের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় কাঠগড়ায় খোদ ফরেন্সিক ডিরেক্টর

রাজস্থানে ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি (FSL)-এর একটি মারাত্মক ভুল রিপোর্টের জেরে এক উচ্চপদস্থ মহিলা সরকারি অফিসারকে বিনা দোষে জেল খাটতে হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে যে, সই বা স্বাক্ষর পরীক্ষার ক্ষেত্রে সমস্ত নিয়মের তোয়াক্কা না করে একটি মনগড়া ও ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছিল, যার ভিত্তিতে তৎকালীন জেলা সংখ্যালঘু কল্যাণ আধিকারিক হেমলতা কাঙ্কারিয়াকে গ্রেফতার করে হাজতে পাঠানো হয়। বর্তমানে স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ (SOG)-এর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে এফএসএল-এর ডেপুটি ডিরেক্টর ড. রমেশ চৌধুরীকে এই জালিয়াতির ঘটনায় সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তদন্তে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রিপোর্ট প্রস্তুত করার সময় নথিপত্র এবং প্রমাণের সঙ্গে বড়সড় কারচুপি করা হয়েছিল। এই ঘটনায় রাজ্য স্বরাষ্ট্র বিভাগ গত ১৩ অক্টোবর তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করেছে।

পুরো ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২১ সালের ২ আগস্ট, যখন রাজস্থানের মহমন্দির থানায় একটি জালিয়াতির মামলা দায়ের করেন রাজেন্দ্র সিং। পুলিশ প্রথমে তদন্তের পর এফআর (Final Report) দাখিল করলেও, বাদীপক্ষ সেই রিপোর্টের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং ২০১০ সালের একটি বিক্রয় দলিলে তৎকালীন নোটারি শ্রাবণ কুমার ওঝার স্বাক্ষরের নতুন করে এফএসএল পরীক্ষার দাবি জানায়। নিয়মানুযায়ী, ২০১০ সালের কোনো স্বাক্ষরের সত্যতা যাচাই করতে হলে তার ঠিক আগের বা পরের তিন বছরের নমুনা সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এফএসএল আধিকারিক ড. রমেশ চৌধুরী সেই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২০১৬ সালের নথির স্বাক্ষরের সঙ্গে তুলনা করে সই মিলছে না বলে একটি ভুল ও বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট পেশ করেন। আর সেই মিথ্যে রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই হেমলতা কাঙ্কারিয়া এবং অন্য তিনজনকে অপরাধী বানিয়ে গ্রেফতার করা হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত এই কারচুপির পুলিশি পদক্ষেপের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করে।

এই চরম হেনস্থার শিকার হয়ে ভুক্তভোগী আধিকারিক হেমলতা কাঙ্কারিয়া ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “এফএসএল-এর একটি ভুলের কারণে আমাকে বিনা অপরাধে জেলে যেতে হয়েছে। এর ফলে সমাজের বুকে আমার সম্মান পুরোপুরি ধুলোয় মিশে গেছে, যাকে একপ্রকার সামাজিক হত্যা বলা চলে। এই মিথ্যে কলঙ্কের জেরে আমার ছেলের পাকা হওয়া সগাই পর্যন্ত ভেঙে গেছে। আজ তদন্তে সত্য সামনে এসেছে এবং আমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছি, কিন্তু শুধু একটি চার্জশিট পেশ করলেই কি প্রকৃত ন্যায়বিচার মেলে? যে পুলিশকর্মীরা জেনেশুনে ভুলের নথিপত্র ফরেন্সিকে পাঠিয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ করা হয়নি কেন?” প্রসঙ্গত, অভিযুক্ত এফএসএল ডেপুটি ডিরেক্টর ড. রমেশ চৌধুরীর বিরুদ্ধে এর আগেও বেশ কয়েকটি ভুয়া ও কুচক্রী রিপোর্ট দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ বিচারাধীন রয়েছে। হেমলতা কাঙ্কারিয়ার মামলায় এসওজি তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে।

এই ন্যক্কারজনক ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রতাপ সিং খাচারিয়াওয়াসের সরকারপক্ষকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন যে, বিচারব্যবস্থায় ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যার ওপর পুলিশ এবং আদালত উভয়েই অন্ধের মতো ভরসা করে। কিন্তু এটা অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, খোদ এফএসএল-এর একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি ডিরেক্টর জেনেশুনে ভুল রিপোর্ট দিয়ে একজন নির্দোষ মহিলাকে বছরের পর বছর মানসিক যন্ত্রণা ও জেলের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছেন। এ ধরনের দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনো রকম নমনীয়তা না দেখিয়ে অবিলম্বে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষের আইনের শাসন ও সংস্থার ওপর ভরসা অটুট থাকে।