যক্ষ্মার চিকিৎসায় বড় ধাক্কা মার্কিন সংস্থার! পেটেন্ট আবেদন খারিজ হতেই কি সস্তায় মিলবে জীবনদায়ী ওষুধ?

আমেরিকান সংস্থা টিবি অ্যালায়েন্সকে ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মার চিকিৎসায় ব্যবহৃত তাদের বিপিএএল (BPaL) থেরাপির জন্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পেটেন্ট দেওয়া হয়নি। ভারতীয় পেটেন্ট অফিস গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬-এ এই আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে কোনো একক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা এই ওষুধের নির্দিষ্ট সংমিশ্রণের উপর একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকার বা মনোপলি বজায় রাখতে পারবে না। যা মূলত জেনেরিক ওষুধ প্রস্তুতকারী ভারতীয় দেশীয় সংস্থাগুলির জন্য উৎপাদনের নতুন পথ প্রশস্ত করেছে। তবে এর জেরে বাজারের অন্যান্য ক্ষেত্রে জীবনদায়ী ওষুধের দাম অবিলম্বে কমবে কিনা, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টিউবারকুলোসিস অ্যান্ড রেসপিরেটরি ডিজিজেসের প্রাক্তন ডিরেক্টর তথা বিশিষ্ট টিবি বিশেষজ্ঞ ডা. রবীন্দ্র কুমার দেওয়ান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সামগ্রিকভাবে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি দেশের সাধারণ রোগীদের স্বাস্থ্যস্বার্থ ও জনকল্যাণেই নেওয়া হয়েছে।
ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট টিবি বা ডিআর-টিবি (DR-TB) হলো যক্ষ্মার এক অত্যন্ত বিপজ্জনক রূপ, যেখানে শরীরের ক্ষতিকারক জীবাণুগুলি প্রচলিত ও সাধারণ ওষুধের বিরুদ্ধে নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। ফলে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ করে তুলতে আরও অনেক শক্তিশালী ওষুধের জোগান প্রয়োজন হয়। অতীতে এই ধরনের রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী ও কষ্টকর চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যেতে হতো। এমনকি কিছু পুরোনো চিকিৎসাপদ্ধতিতে নিয়মিত ইনজেকশন দেওয়ার মতো কঠোর নিয়ম থাকায় রোগীদের শ্রবণশক্তি হ্রাসের মতো মারাত্মক এবং স্থায়ী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকত। এই প্রেক্ষাপটে বিপিএএল (BPaL) হলো মূলত তিনটি শক্তিশালী ওষুধের একটি বিশেষ সংমিশ্রণ—যার মধ্যে রয়েছে বেডাকুইলিন, প্রেটোম্যানিড এবং লিনেজোলিড। ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মায় আক্রান্ত নির্দিষ্ট কিছু রোগীর চিকিৎসায় এই পদ্ধতি প্রায় ছয় মাস একটানা সেবন করতে হয়। অন্যদিকে, ভারতের সরকারি স্তরে জাতীয় যক্ষ্মা নির্মূল কর্মসূচির আওতায় বিপিএএলএম (BPaLM) নামে আরেকটি উন্নত পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, যেখানে এই তিনটি প্রধান ওষুধের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে মক্সিফ্লক্সাসিন অন্তর্ভুক্ত থাকে। চিকিৎসকরা রোগীর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।
মার্কিন অলাভজনক সংস্থা ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর টিবি ড্রাগ ডেভেলপমেন্ট’ এই তিনটি ওষুধের একটি নির্দিষ্ট মাত্রার সমন্বয় এবং তার বিশেষ ব্যবহারের জন্য ভারতের পেটেন্ট দপ্তরে আবেদন দাখিল করেছিল। সংস্থার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ওষুধ তিনটি একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় সহজলভ্য করে রোগীদের গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজ করা। তবে রোগীর মৌলিক অধিকার রক্ষা ও সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ সরবরাহের দাবিতে সোচ্চার বিভিন্ন সংগঠন এই আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করে যুক্তি দেয় যে, এই উপাদানগুলি বহু পুরনো এবং সুপরিচিত। কেবল সেগুলোকে নির্দিষ্ট অনুপাতে একত্রিত করা কোনো মৌলিক বা নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পর্যায়ে পড়ে না। ফলস্বরূপ, পেটেন্ট অফিস এই আবেদন খারিজ করে জানায় যে এই সংমিশ্রণ কোনো পেটেন্টযোগ্য উদ্ভাবন নয়। ভারতের পেটেন্ট আইনের ৩(ডি) ধারা অনুযায়ী, বিদ্যমান কোনো ওষুধে সামান্য পরিবর্তন এনে সেটিকে নতুন ওষুধ হিসেবে পেটেন্ট পাওয়া নিষিদ্ধ, যা সাধারণত ‘এভারগ্রিনিং’ হিসেবে পরিচিত। ডা. দেওয়ান জানান, ভারতের স্বাস্থ্যনীতির মূল লক্ষ্য হলো টিবি, ক্যান্সার ও হৃদরোগের মতো মারাত্মক রোগের চিকিৎসায় সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ নিশ্চিত করা।
বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে যক্ষ্মা চিকিৎসায় নিবন্ধিত রোগীরা বিনামূল্যে ওষুধ পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে দেশীয় বিকল্প চলে আসতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও সাপ্লাই চেইন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।