তিহাস আর বিশ্বাসের অদ্ভুত মেলবন্ধন! জানেন কি কেন এই দেবীর নাম হয়েছিল ‘পেটকাটি মা’?

কখন যে ইতিহাস আর বিশ্বাসের অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটে যায়, তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির পেটকাটি অঞ্চলে এমন এক রহস্যময় ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে শতবর্ষী প্রাচীন একটি মন্দির। চাষবাসের সময় মাঠে মাটি খুঁড়তে গিয়ে কোদালের কোপে যে দেবীমূর্তির পেটের অংশ কেটে গিয়েছিল, লোকমুখে সেই থেকেই তিনি পরিচিত হয়েছেন ‘পেটকাটি মা’ হিসেবে। কষ্টিপাথরের সেই প্রাচীন ও অনন্য দেবীমূর্তি ঘিরেই আজও জড়িয়ে রয়েছে গা ছমছমে রহস্য এবং অগণিত ভক্তের অগাধ বিশ্বাস। প্রতিবছর কালীপুজো এলেই এই মন্দির চত্বর হাজার হাজার ভক্তের সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে।

কীভাবে আবির্ভূত হলেন পেটকাটি মা?

ময়নাগুড়ি শহরের পেটকাটি এলাকার কালো কষ্টিপাথরের এই প্রাচীন দেবীমূর্তি আর পাঁচটি সাধারণ প্রতিমার থেকে একদমই আলাদা। এটি আদতে কালী হিসেবে পূজিত হলেও, তা চণ্ডী নাকি তন্ত্রমতে অন্য কোনো দেবীমূর্তি—তা নিয়ে ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মধ্যেও বিতর্ক রয়েছে। দেবীর পেট কাটা থাকার কারণে স্থানীয় রাজবংশী সমাজ এবং এলাকাবাসীর কাছে তিনি ‘পেটকাটি মা’ নামেই সর্বপরিচিত। স্থানীয়দের মতে, মূর্তিটি ধূমাবতি চণ্ডী কালী হিসেবেই তন্ত্রমতে পূজিত হন। তবে এই বহুমূল্য কষ্টিপাথরের মূর্তিটি ঠিক কোন সময়ে বা কোন শতাব্দীতে মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক প্রামাণ্য নথি নেই।

মন্দিরের কার্যকরী কমিটির সদস্য নেপাল সরকার জানান, “আমাদের এই ধূমাবতি পেটকাটি চণ্ডীমাতার মন্দির অত্যন্ত জাগ্রত। দেবীর মূর্তির গায়ে দেবদেবী ও পশুপাখির খোদাই করা রূপ রয়েছে। কালী পুজোর দিন এখানে সম্পূর্ণ তন্ত্রমতে পুজো হয়। পুজোর দিনকে কেন্দ্র করে এখানে বিরাট মেলার আয়োজন করা হয়। মায়ের দর্শনে দূরদূরান্ত থেকে অগণিত ভক্ত আসেন এবং মনস্কামনা পূর্ণ হলে তাঁরা বারবার ছুটে আসেন।”

মূর্তির অনন্য গঠন ও রহস্যময় বৈশিষ্ট্য

প্রায় সাড়ে চার ফুট উচ্চতার কষ্টিপাথরের এই মূর্তিটি পদ্মের উপর আসীন। দেবীর সারা শরীরে জড়িয়ে রয়েছে সাপের মালা। মাথার ঠিক উপরে হাতি এবং পেটের মধ্যে একটি বিছের ছবি খোদাই করা রয়েছে। দেবীর পায়ের নিচে রয়েছে নারী মূর্তি, একদিকে শেয়াল ও পেঁচা।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মা এখানে দশভুজা হলেও কালের প্রবাহে তাঁর তিনটি হাত ভেঙে গিয়েছে। বাঁ দিকের পাঁচটি হাতে রয়েছে হাতি, ঘণ্টা, ছিন্ন নরমুণ্ড, নরমূর্তি এবং একটি ভাঙা হাত। দেবীর গলায় ঝুলছে নরমুণ্ডের মালা।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা মনা রায় বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি যে আমাদের কোনো পূর্বপুরুষ চাষাবাদ করতে গিয়েই এই মূর্তিটি উদ্ধার করেছিলেন। কোদালের কোপে মায়ের পেট কেটে যাওয়ায় নাম হয়েছিল পেটকাটি। এমনকি মায়ের নামানুসারেই এই গ্রামের নামও পেটকাটি হয়ে গেছে।”

অন্যান্য স্থানীয় বাসিন্দা প্রসেনজিৎ মণ্ডল জানান, মূর্তির গঠনশৈলীতে পাগড়ি, হাতির প্রতিকৃতি এবং পেটের ওপর বিছার ছবি থাকার কারণে এটি অত্যন্ত দুর্লভ ও রহস্যময়।

কী বলছেন ইতিহাস গবেষকরা?

জলপাইগুড়ির প্রখ্যাত ইতিহাস গবেষক উমেশ শর্মা বলেন, “ময়নাগুড়ির ধূমাবতি পেটকাটি কালী নামে পরিচিত হলেও ইনি মূলত চণ্ডী কালী হিসেবেই তন্ত্রমতে পূজিত হন। স্থানীয় জমিদারদের দান করা জমিতে এই প্রাচীন মন্দির স্থাপন করা হয়েছিল। এলাকার কৃষিজমিতে চাষবাসের সময় মাটি কাটতে গিয়ে মূর্তিটি পাওয়া যায়। যেহেতু কোদালের আঘাতে মূর্তির পেট কেটে গিয়েছিল, তাই এর নাম পেটকাটি হয়। এই মূর্তির সঙ্গে সাধারণ কোনো দেবীর মূর্তির মিল নেই। সম্পূর্ণ এক রহস্যাবৃত আড়ালে রয়েছেন এই পেটকাটি মা।”

অজানা ইতিহাস, গা ছমছমে লোককথা আর অগাধ ভক্তিকে সঙ্গী করে চলা ময়নাগুড়ির এই পেটকাটি মায়ের পুজো আজও উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় আধ্যাত্মিক আকর্ষণ। কালীপুজোর রাতে যজ্ঞ ও বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে যখন এই মন্দির চত্বর আলোয় সেজে ওঠে, তখন ভক্তির এক অপূর্ব জোয়ার দেখতে পান পুণ্যার্থীরা।