ছুরি হাতে হামলা চালাতেই মুহূর্তে বদলে গেল দৃশ্যপট! মৃত্যুর মুখ থেকে যাত্রীদের ফিরিয়ে আনা সেই বীর পাইলটের অজানা লড়াই

ছোটবেলায় বিমানচালক হওয়ার কোনো স্বপ্নই ছিল না তাঁর। পরিবারের প্রতিষ্ঠিত টেক্সটাইল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়েই পড়াশোনা শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু একটি বিমান সংক্রান্ত সেমিনার তাঁর জীবনের সম্পূর্ণ গতিপথ বদলে দেয়। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ম্যানেজমেন্ট, এবং সেখান থেকে নিউজিল্যান্ডে পাইলটের কঠোর প্রশিক্ষণ—দীর্ঘ ১৩ বছরের এক অভাবনীয় যাত্রার পর সেই তরুণই আজ ফ্লাইদুবাইয়ের ককপিটে বসে ১৭৪ জন যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গত ৩০ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের সাহসিকতা এখন সব মহলে প্রশংসিত হচ্ছে।
স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর পর স্মিত মাচ্ছার প্রথমে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী পারিবারিক ব্যবসায় হাত লাগানোর পরিকল্পনা থাকলেও, মুম্বইয়ের ওয়েলিংকর ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টে ম্যানেজমেন্ট পড়ার সময় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। প্রায় ১৯ বছর বয়সে একটি এভিয়েশন সেমিনারে যোগ দেওয়ার পরেই প্রথম বিমান চালানোর প্রতি তাঁর তীব্র আগ্রহ জন্মে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। পাইলট হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি নিউজিল্যান্ডে উড়ে যান এবং সেখান থেকেই পাইলট হিসেবে পেশাদার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি স্পাইসজেটে যোগ দেন। বাণিজ্যিক বিমানচালক হিসেবে তাঁর প্রথম উড়ান ছিল বেঙ্গালুরু থেকে দিল্লি রুটে। মূলত বোয়িং ৭৩৭ বিমান চালানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
স্পাইসজেটে দীর্ঘ ১১ বছরেরও বেশি সময় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন স্মিত। ২০১১ সালের জুনে এই সংস্থায় যোগ দেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে সিনিয়র কমান্ডার এবং পরবর্তীতে লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পান। তাঁর পেশাগত প্রোফাইল অনুযায়ী, বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এবং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ ও ৯ বিমান মিলিয়ে তাঁর মোট উড়ানের অভিজ্ঞতা প্রায় ৯,৭৫০ ঘণ্টা। এর মধ্যে স্পাইসজেটেই পাইলট-ইন-কমান্ড হিসেবে তাঁর ৬,৪০০ ঘণ্টারও বেশি ওড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০২২ সালের জুনে স্পাইসজেট ছেড়ে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে ডাইরেক্ট-এন্ট্রি ক্যাপ্টেন হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানের কমান্ডে ছিলেন এই অভিজ্ঞ পাইলট। দুবাই থেকে তেল আভিভগামী বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটিতে ২৭ জন শিশুসহ মোট ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন। সেই সময়ই বিমানের সহ-পायलট তথা ওমানের এক নাগরিক ছুরি নিয়ে তাঁর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালান এবং বিমানটি ধ্বংস করার চেষ্টা করেন। ফ্লাইট ডেটা অনুযায়ী, এই ধস্তাধস্তির জেরে ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট নিচে নেমে যায় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ৭৭০০ ও ৭৫০০ স্কোয়াক কোড ব্যবহার করা হয়। গুরুতর রক্তাক্ত ও আহত অবস্থাতেও অসীম সাহসিকতা দেখিয়ে স্মিত ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর অন্য কর্মী ও যাত্রীরা মিলে সহ-পायलটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং বিমানে থাকা ফ্লাইদুবাইয়ের দুই অফ-ডিউটি পাইলটের সাহায্যে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। মুম্বইয়ের বাসিন্দা স্মিত মাচ্ছারকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাঁর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছেন।