সন্ধ্যা নামলেই মন্দিরে শিবভক্ত কচ্ছপ! প্রসাদ নিয়ে ফের জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার রহস্যে চোখ কপালে সবার

উত্তরাখণ্ডের নৈনিতাল জেলার রামনগরের ধিকুলি গ্রামে অবস্থিত প্রাচীন গরাল কান্তেশ্বর মহাদেব মন্দিরটি বর্তমানে গোটা এলাকায় দারুণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ঐতিহ্য ও পৌরাণিক বিশ্বাসের পাশাপাশি এই মন্দিরটি খবরের শিরোনামে উঠে আসার কারণ এক অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য ঘটনা। গত বেশ কয়েক বছর ধরে করবেট অঞ্চলের বাফার জোনে, বন ও নদীর মাঝখানে অবস্থিত এই মন্দিরে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামতেই হাজির হয় একটি বিশাল কচ্ছপ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মন্দিরে কচ্ছপটির আসার সময় এবং নির্দিষ্ট পথ একদম পাকা ঘড়ির কাঁটার মতো নিখুঁত! মন্দিরে পৌঁছে কিছু সময় কাটানো, প্রসাদ গ্রহণ করা এবং তারপর আবার চুপিসারে জঙ্গলে ফিরে যাওয়াই তার প্রতিদিনের রুটিন।

মহাভারত যুগের ইতিহাস ও স্থানীয় বিশ্বাস

গরাল কান্তেশ্বর মহাদেব মন্দিরটিকে ঘিরে জড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন পৌরাণিক কিংবদন্তি। স্থানীয় মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস, এই মন্দিরটি সরাসরি মহাভারতের সময়কালের। লোককথা অনুযায়ী, পাণ্ডবরা তাঁদের বনবাসকালে এই অঞ্চলে এসেছিলেন এবং এখানেই একটি পবিত্র শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জনশ্রুতি রয়েছে যে, স্বয়ং মহাবীর ভীম এই শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছিলেন। আর সেই প্রাচীন পবিত্র মন্দিরেই এমন অলৌকিক কচ্ছপের আগমন ভক্তদের মনে গভীর ধর্মীয় ভাবাবেগের জন্ম দিয়েছে।

রুটিন বাঁধা কচ্ছপের যাতায়াত

ধিকুলির স্থানীয় বাসিন্দা তথা বন্যপ্রাণী অনুরাগী সঞ্জয় ছিমওয়ালের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, তিনি বহু বছর ধরে এই কচ্ছপটিকে নিয়মিত মন্দিরে আসতে দেখছেন। তাঁর কথায়, কচ্ছপটি ঠিক গোধূলি বেলায় মন্দিরে আসে, মন্দিরের পুজারী বা ভক্তরা তাকে প্রসাদ নিবেদন করেন এবং কিছুক্ষণ পর সে একই রাস্তা ধরে আবার জঙ্গলে মিলিয়ে যায়। কচ্ছপটির রাস্তাটি যেন পুরোপুরি মুখস্থ! এটিকে সাধারণ মানুষের অনেকে বিশুদ্ধ ভক্তি ও শিবভক্তি হিসেবে দেখলেও, একটি সরীসৃপের বছরের পর বছর ধরে ঠিক সময়ে একই পথ ধরে মন্দিরে আসা নিঃসন্দেহে এক অবাক করা ঘটনা।

বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস: কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

এই ঘটনার পেছনে অলৌকিক বা ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়াও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ খুঁজছেন বিশেষজ্ঞরা। রামনগর পিএনজিপিজি সরকারি স্নাতকোত্তর কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ এম সি পান্ডের মতে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে মন্দিরে কচ্ছপটির এই ধারাবাহিক আগমন অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক এবং এটি একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণার বিষয়। এটিকে কেবল খাদ্যের লোভ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা যদি কচ্ছপটির গতিবিধি, চলাচলের পথ এবং তার খাদ্যাভ্যাস নিয়ে গবেষণা করেন, তবে এর আসল কারণ স্পষ্ট হতে পারে।

অন্যদিকে, করবেট টাইগার রিজার্ভের পার্ক ওয়ার্ডেন বিন্দর পাল সিংয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বর্ষাকালে কচ্ছপসহ বিভিন্ন সরীসৃপ প্রায়শই তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান ছেড়ে অন্যত্র যাতায়াত করে। যেহেতু মন্দিরটি নদী, ঝর্ণা ও বনাঞ্চলের খুব কাছাকাছি অবস্থিত, তাই সেখানে কচ্ছপের আগমন অসম্ভব কিছু নয়। হয়তো মন্দিরের খাবার বা জলের আকর্ষণই তাকে বারবার সেখানে টেনে আনে। কারণ যাই হোক না কেন, বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের এই অদ্ভুত সমীকরণে গরাল কান্তেশ্বর মহাদেব মন্দিরের এই রহস্যময় কচ্ছপটি এখন সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।