চোখ বেঁধে শিশুকন্যা বেছে নিয়েছিল মূর্তি! আড়াইশো বছরের পুরনো জমিদারি পুজোর অবিশ্বাস্য ইতিহাস

চারদিকে এখন ঢাকের আওয়াজ আর প্যান্ডেল বাঁধার ধুম। আসন্ন দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সেজে উঠছে শহর থেকে গ্রাম। তবে শুধু বারোয়ারি পুজোই নয়, বিশেষত্ব আর ঐতিহ্যের নিরিখে বাংলার বহু রাজবাড়ি ও জমিদার বাড়ির আরাধনা আজও অনন্য। তেমনই এক ব্যতিক্রমী ও অলৌকিক ঘটনার ইতিহাস বহন করে চলেছে পূর্ব বর্ধমানের বড়শুলের ‘দে’ পরিবারের দুর্গাপুজো। প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো এই পুজোয় দেবীর রূপ অন্যান্য আর ১০টি মণ্ডপের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
মহাদেবের উরুতে দ্বিভূজা মা দুর্গা, নেই কোনো মহিষাসুর!
বড়শুলের দে বাড়ির পুজোয় দেবী দুর্গা দশভুজা নন, তিনি দ্বিভূজা। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এখানে দেবীর কোনো বাহন বা মহিষাসুর নেই। দেবী দুর্গা অবস্থান করেন মহাদেবের বাম উরুতে। দেবীর পাশে থাকেন স্বামী মহাদেব, সঙ্গে সন্তান কার্তিক ও গণেশ। মহাদেব, গণেশ ও কার্তিকের বাহন থাকলেও মা দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী—কারোরই নিজস্ব বাহন থাকে না এই মণ্ডপে। আনুমানিক আড়াইশো বছর ধরে এই হরগৌরী রূপেই দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে।
শিশুকন্যার চোখ বেঁধে প্রতিমা নির্বাচন: এক অলৌকিক সূচনা
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বড়শুলের জমিদার যাদবচন্দ্র দে-র আমলে প্রথমে ঘটে এই পুজো শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে জমিদার গৌরপ্রসাদ দে-র সময়ে প্রতিমা পুজোর প্রচলন হয়। কথিত আছে, দামোদর নদ ও জিটি রোড কাছে হওয়ায় সেই যুগে বহু সাধুসন্ত এসে এই জমিদার বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। তেমনই কয়েকজন সাধু তাঁদের ঝোলা থেকে মা দুর্গার বিভিন্ন রূপের মাটির পুতুল বের করেন। এরপর পরিবারের এক ছোট শিশুকন্যার চোখ বেঁধে তার মধ্য থেকে একটি পুতুল তুলতে বলা হয়। শিশুটি হাত বাড়িয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় হরগৌরীর পুতুলটি তুলে নেয়। সেই থেকে বৈচিত্র্যময় এই রূপেই আরাধনা শুরু হয় পরিবারে।
কঠিন নিয়ম ও বলিদানের অদ্ভুত রীতি
দে পরিবার বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হলেও গুরুদেবের পরামর্শে এখানে গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা মেনে শাক্ত মতে পুজো পরিচালনা করা হয়। সপ্তমীতে একটি ছাঁচিকুমড়ো, অষ্টমীতে ছাগবলি এবং নবমীতে তিনটি ছাঁচিকুমড়ো, চারটি শসা, বাতাবি লেবু ও মূলসহ তিনটি আখ বলি দেওয়া হয়। তবে নিয়ম অনুযায়ী, বলির কোনো সামগ্রীই পরিবারের সদস্যরা গ্রহণ করতে পারেন না। একসময় বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা বাড়ির কামানের শব্দ শুনে এই বাড়ির সন্ধিপুজোর বলিদান শুরু হতো। এখন সেই প্রথা অতীত হলেও ঘড়ির সময় মেপেই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয় যাবতীয় নিয়ম।
জৌলুস কমলেও কমেনি আভিজাত্য
কালের নিয়মে হারিয়ে গেছে ঠাকুরদালানের কুইন্টাল ওজনের সেই বিশালাকার ঘণ্টা কিংবা রেড়ির তেলের প্রদীপ-ঝাড়বাতির রোশনাই। নবমীর বিশেষ আকর্ষণ ‘বাঘ নাচ’-ও এখন ইতিহাস। তবুও পুজোর দিনগুলিতে আজও সমস্ত নিয়ম ও আচার অটুট রয়েছে। দশমীর দিন দেবীকে কাঁধে করে পুরো গ্রাম ঘোরানোর পর বিসর্জন দেওয়া হয়। পুরোনো জৌলুস হয়তো কিছুটা ফিকে হয়েছে, কিন্তু দূর-দূরান্ত থেকে পরিবারের সদস্যরা আজও একত্রিত হন এই ঐতিহ্যবাহী আড়াইশো বছরের প্রথাকে বাঁচিয়ে রাখতে।