পুজোর ভোগ ঝুলিয়ে রাখা হয় উঁচুতে! ক্যালি কাড়াকাড়ি করে তা ছিনিয়ে নেওয়ার অদ্ভুত খেলা, কোথায় হয় এমন ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব?

কলকাতা যখন নিত্যনতুন থিমের পুজোয় সেজে ওঠার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, উত্তর দিনাজপুরের ইটাহার ব্লকের দুর্গাপুরে তখন শতবর্ষের ঐতিহ্য মেখে দাঁড়িয়ে রাজবাড়ির পুজো। রাজা ভূপাল চন্দ্র রায় চৌধুরীর হাত ধরে পথচলা শুরু হওয়া ভূপালপুর রাজবাড়ির এই পুজোকে ঘিরে আজ বহু বছর পরেও মেতে ওঠেন আশপাশের সমস্ত এলাকার হাজার হাজার মানুষ। তবে শুধু ইতিহাসই নয়, এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অত্যন্ত বিরল ও অদ্ভুত এক প্রসাদ বিতরণের রীতি।
উঁচুতে বেঁধে রাখা হয় ভোগ, কাড়াকাড়ির খেলায় মাতেন ভক্তরা এই রাজবাড়ির পুজোর সবথেকে চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয় অঙ্গ হল নবমীর পুজো শেষে প্রসাদ বিতরণের অদ্ভুত প্রক্রিয়া। নবমীর পুজো শেষে সমস্ত প্রসাদী ফল ও ভোগ ঠাকুরদালানের বেশ উঁচুতে ঝুলিয়ে বেঁধে রাখা হয়। এরপর গ্রামের বাসিন্দা ও রাজপরিবারের সদস্যরা মিলে একটি বিশেষ খেলার আমেজ তৈরি করেন। কে কত দ্রুত এবং কীভাবে সেই উঁচুতে ঝুলিয়ে রাখা ফল-প্রসাদ পেড়ে নিতে পারছেন, তা নিয়েই শুরু হয় এক মজাদার লড়াই। কালক্রমে সামাজিক পরিবর্তন হলেও এই পুজো ঘিরে এই খেলা আজও সমান রঙিন ও উন্মাদনাময়।
নদীগর্ভে তলে গিয়েছিল রাজপ্রাসাদ, তারপর তৈরি ইতিহাস রাজপরিবারের বর্তমান বংশধর অভিষেক রায় চৌধুরী জানান, তাদের আদি বাড়ি ছিল ইটাহারের চূড়ামন এলাকায়। একসময় হঠাৎই মহানন্দা নদীর করাল গ্রাসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় পুরো রাজপ্রাসাদ ও রাজ্যপাট। গৃহহারা হওয়ার পর তাঁরা দুর্গাপুরে নতুন প্রাসাদ এবং দেবী দুর্গার মন্দির নির্মাণ করেন।
আগে এই রাজবাড়িতে মহালয়ার দিনেই দেবী দুর্গার বোধন হতো এবং জোড়া মোষ ও পাঁঠা বলির প্রচলন ছিল। মহালয়া থেকেই বসত যাত্রাপালা, সার্কাস ও থিয়েটারের মেলা। সময়ের সাথে সাথে পাঁঠাবলি বন্ধ হলেও এবং বোধন ষষ্ঠীতে স্থানান্তরিত হলেও নিয়ম-নিষ্ঠায় কোনো খামতি আসেনি।
প্রতিমার এক অনন্য রূপভেদ এখানে দেবী দুর্গা পূজিতা হন সনাতনী একচালার ডাকের সাজের প্রতিমায়। তবে এই প্রতিমার কিছু বিশেষত্ব দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এখানে অসুরের গায়ের রঙ ঘন সবুজ, আর দেবী দুর্গার মাথার ঠিক উপরে অধিষ্ঠান করেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর।
পূর্বে রাজবাড়ির পুজো দেখতে বহু দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ গরুর গাড়ি চেপে পৌঁছতেন। আজ যাতায়াতের মাধ্যম বদলালেও উত্তর দিনাজপুরের এই রাজবাড়ির মেলা ও পুজো দেখতে ভিড় জমান অগণিত পুজোপ্রেমী। দশমীতে বসে বিশাল মেলা, যার টানেই আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে ওঠে ইটাহারের দুর্গাপুরে।