অ্যান্টার্কটিকার ২ কিমি গভীরে ধরা পড়ল ‘ভূতুড়ে কণা’! পদার্থবিদ্যায় নোবেল জিতে তাক লাগালেন ফ্রান্সিস হালজেন

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সুদূর ও রহস্যময় কোণ থেকে ধেয়ে আসা মহাজাগতিক কণার খোঁজে কেটেছে জীবনের দীর্ঘ সময়। বরফের পুরু আস্তরণের হাজার ফুট গভীরে বসিয়েছিলেন নজরদারি চোখ। সেই অসামান্য ও যুগান্তকারী গবেষণার চূড়ান্ত স্বীকৃতি মিলল অবশেষে। ২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় এককভাবে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন বেলজিয়ান-আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন (Francis Halzen)।
মঙ্গলবার সুইডিশ রয়্যাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের পক্ষ থেকে এই ঐতিহাসিক নাম ঘোষণা করা হয়।
ধরা দিল অধরা ‘ভূতুড়ে কণা’!
বিজ্ঞানের পরিভাষায় যে কণা আবিষ্কার ও শনাক্তকরণের জন্য ৮২ বছর বয়সি অধ্যাপক হালজেনকে এই সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হলো, তাকে চলতি কথায় বলা হয় ‘ভূতুড়ে কণা’ (Ghost Particle) এবং বিজ্ঞানের ভাষায় ‘নিউট্রিনো’।
এই কণাগুলির বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত বিস্ময়কর:
এদের ভর প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
সাধারণ পদার্থের সঙ্গে কোনো ধরনের বিক্রিয়া করে না।
কোটি কোটি কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে অতি অনায়াসে পৃথিবীর বুক চিরে এপার-ওপার চলে যেতে পারে—কাউকে কোনো টের পেতে না দিয়ে!
সেই অদৃশ্য ও অধরা কণাকেই ফাঁদে ফেলে মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উদঘাটনের পথ দেখিয়েছেন উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।
অ্যান্টার্কটিকার বরফে বিশাল ‘চোখ’
বর্তমান বিশ্বের যুগান্তকারী ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ (IceCube Neutrino Observatory)-র প্রধান রূপকার হালজেন। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রথম প্রস্তাব করেন, মহাজাগতিক নিউট্রিনো শনাক্ত করতে অ্যান্টার্কটিকার সুগভীর ও স্বচ্ছ বরফকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তৎকালীন সময়ে অনেক বিজ্ঞানী এই ভাবনাকে অসম্ভব বললেও পিছপা হননি তিনি। দক্ষিণ মেরুর ‘আমন্ডসেন-স্কট’ স্টেশনে গড়ে ওঠে এক সুবিশাল গবেষণাগার।
বরফের পৃষ্ঠতল থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার গভীরে বসানো হয় হাজার হাজার লাইট সেন্সর।
সুদূর মহাকাশের ব্ল্যাক হোল বা সুপারনোভার মতো বিপজ্জনক জায়গা থেকে যখন উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো এসে বরফের পরমাণুতে আঘাত করে, তখন এক ক্ষণস্থায়ী আলোর ঝলক তৈরি হয়।
সেই আলো সেন্সরে ধরা পড়লেই উন্মোচিত হয় দূর ছায়াপথের হাজার বছরের গোপন বার্তা।
খবর পেয়ে স্তম্ভিত নোবেলজয়ী
২০১১ সাল থেকে পুরোদমে চালু হওয়া এই আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে বর্তমানে ১৪টি দেশের সাড়ে চারশরও বেশি গবেষক যুক্ত রয়েছেন, যার শীর্ষ নেতৃত্ব দিচ্ছেন হালজেন নিজেই। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান মার্ক পিয়ার্স জানান, হালজেনের এই উদ্ভাবন জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
ইতালিতে এক বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েই নিজের নোবেল জয়ের বার্তা পান বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী। প্রতিক্রিয়ায় উচ্ছ্বসিত হালজেন বলেন:
“খবরটা পেয়ে সত্যি আমি স্তম্ভিত ও আনন্দিত। যখন আইসকিউব প্রজেক্ট শুরু করেছিলাম, তখন আমরা কেউই নিশ্চিত ছিলাম না যে বরফের অতলে এই অভিযানে আদৌ সফল হব কিনা।”
পুরস্কার হিসেবে তিনি পাবেন ১২ লক্ষ মার্কিন ডলার (প্রায় ১২ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা)। আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে নোবেল মেডেল ও সম্মাননা পত্র।