ঢাকার মিরপুরে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোটা বাংলাদেশ এখন বিচারের দাবিতে উত্তাল। দেশজুড়ে চলছে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড়। পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিলেও, জনমনে জেগেছে গভীর সংশয়। গত দুই দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর দীর্ঘসূত্রতার ইতিহাসই এই সংশয়ের মূল কারণ। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, রামিসার খুনিদের সাজা কি আদৌ দ্রুত কার্যকর হবে? নাকি রসু খাঁ-র মতো ঝুলে থাকবে বিচার প্রক্রিয়া?
বাংলাদেশে আলোচিত অনেক খুনের ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকার নজির রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ংকর নাম ‘সিরিয়াল কিলার’ রসু খাঁ। ১১ জন নারীকে হত্যা এবং হত্যার আগে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রসু খাঁ-র মামলার গতিপ্রকৃতি যেন বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার এক জীবন্ত দলিল। ২০১৫ সালে নিম্ন আদালতে সাজা পাওয়ার পর, ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতেও তার মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। হাইকোর্ট তাকে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করলেও, রায় ঘোষণার দুই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও আপিল শুনানি সম্পন্ন হয়নি, কার্যকর হয়নি সাজা।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের মতে, বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ ও দীর্ঘসূত্রতা অনেক মামলার মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। মামলার জট আর জটিল আইনি লড়াইয়ের কারণে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বছরের পর বছর ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কাটিয়ে দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক অবশ্য আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই রসু খাঁ-র মামলার রায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই সংশয়ের মূল কারণ হলো মামলার নিষ্পত্তিতে হতাশাজনক পরিসংখ্যান। চলতি মাসে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর মামলায় সাজার হার মাত্র তিন শতাংশ! অর্থাৎ, অভিযুক্তদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। অপরাধী শনাক্ত হওয়ার পরও এভাবে খালাস পেয়ে যাওয়ার হার বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে নামিয়ে দিচ্ছে।
রামিসার পরিবারসহ দেশের প্রতিটি মানুষ এখন কেবল আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে পারছে না। তারা চায় রামিসার খুনিদের বিচার যেন রসু খাঁ-র মতো ঝুলে না থাকে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সাজার হার বাড়ানো। রামিসার এই মর্মান্তিক মৃত্যু কি বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে স্তিমিত হয়ে যাবে, নাকি এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক রায়ের সূচনা করবে—তা এখন সময়ের অপেক্ষা।





