রাজ্যজুড়ে যখন ত্রাণ দুর্নীতি ও শাসকদলের নেতাদের বিরুদ্ধে জনরোষ তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়েই এক সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এবং নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী থাকল বসিরহাট। সরকারি ত্রাণ সামগ্রী আত্মসাৎ করার অভিযোগ যখন বিভিন্ন প্রান্তে শাসকদলের নেতাদের ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করছে, তখন বসিরহাট দক্ষিণের তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় এক ব্যতিক্রমী পথ বেছে নিলেন। বিলি না হওয়া সমস্ত সরকারি ত্রাণ সামগ্রী পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে তিনি এক বড় রাজনৈতিক বার্তা দিলেন।
সূত্রের খবর, বিধায়ক হিসেবে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক পরের দিনই সপ্তর্ষিবাবু বসিরহাটের মহকুমা শাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন তাঁর কাছে গচ্ছিত থাকা সরকারি ত্রাণ সামগ্রী ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বিধায়ক থাকাকালীন তাঁর এলাকার জন্য যে সমস্ত ত্রাণ এসেছিল, তার কিছুটা অংশ বিলি বাকি ছিল। সেই অবশিষ্ট সামগ্রী আর নিজের কাছে রাখতে চাননি তিনি। যদিও প্রথমবার আবেদনের পর কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও প্রশাসন থেকে কোনো সদুত্তর মেলেনি।
অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি বসিরহাটের মহকুমা শাসক এবং পুলিশ সুপারকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান। তাঁর স্পষ্ট অনুরোধ ছিল, প্রশাসন যেন দ্রুত এসে সেই সমস্ত সরকারি সম্পদ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। অবশেষে নতুন সরকার গঠনের প্রায় এক মাস পর প্রশাসনের টনক নড়ে। গতকাল, ৮ জুন পুলিশি উদ্যোগে প্রাক্তন বিধায়কের বাড়ির গোডাউন থেকে বিপুল পরিমাণ শাড়ি, কাপড়, ত্রিপল ও অন্যান্য সরকারি ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয়।
নিজের এই পদক্ষেপ নিয়ে সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমার জানা নেই এর আগে কোনো বিধায়ক এভাবে সরকারের দেওয়া অনুদান বা ত্রাণ সামগ্রী ফেরত দিয়েছেন কি না। এটা কীভাবে হস্তান্তর করতে হয়, সে ব্যাপারে প্রশাসনের কাছে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশিকাও ছিল না। তবে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সরকারের জিনিস সরকারকে ফিরিয়ে দেওয়াই নৈতিক দায়িত্ব। আমি দায় ঝেড়ে ফেলার জন্য এটা করিনি, বরং ওই সামগ্রীগুলো আমার আর প্রয়োজন নেই বলেই প্রশাসনকে ফিরিয়ে দিয়েছি।”
তাঁর এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক মহলে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমনকি বিরোধী শিবির থেকেও তাঁকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। বিজেপির বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি রাজেন্দ্র সাহা এই ঘটনার প্রশংসা করে বলেন, “তৃণমূলের সমস্ত বিধায়ক যদি সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো স্বচ্ছ চিন্তাধারার হতেন, তবে আজ রাজ্যজুড়ে চোর ও লুটেরাদের এত দাপট থাকত না। তাঁর এই সততা ও সাহসিকতাকে কুর্নিশ জানাই।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসকদলের অন্দরে যখন দুর্নীতির অভিযোগে অস্বস্তি বাড়ছে, তখন প্রাক্তন বিধায়কের এই ‘উলট পুরাণ’ নতুন করে চর্চায় উঠে এল।





