কোলাঘাটের বলাকা মঞ্চে আয়োজিত মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠক মঙ্গলবার রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম—এই তিন জেলার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের পর্যালোচনা করার জন্য ডাকা এই বৈঠকে হাজির ছিলেন প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা। তবে সভার মূল আকর্ষণ ছিল শাসকদলের বিরোধী শিবিরের নেতা-নেত্রীদের অভূতপূর্ব উপস্থিতি।
এদিন বৈঠকে জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলাশাসক থেকে শুরু করে এসডিও এবং বিডিও পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, সরকারি প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। প্রশাসনিক আধিকারিকদের পাশাপাশি জেলার সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়েও রূপরেখা তৈরি করা হয়।
তবে রাজনৈতিক মহলের নজর ছিল বৈঠকের আমন্ত্রিত তালিকার দিকে। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে বিদ্রোহের আঁচ ক্রমশ বাড়ছে, আর সেই আবহে বিরোধী শিবিরের বিধায়ক ও সাংসদদের এই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এদিন কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা এবং মেদিনীপুরের সাংসদ জুন মালিয়াকে বৈঠকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। সেই সঙ্গে ঘাটালে সাংসদ দেবের উপস্থিতিও ছিল বাড়তি আলোচনার খোরাক। শাসকদলের বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিত এই জনপ্রতিনিধিদের মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোয় প্রশ্ন উঠছে, তবে কি দলীয় মতপার্থক্য ভুলে এবার উন্নয়নের প্রশ্নে একজোট হওয়ার বার্তা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী?
বৈঠকে অংশ নিয়ে আপ্লুত কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা। তিনি খোলাখুলিই এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। শিউলি সাহার দাবি, “এটি একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এর আগে বিরোধী বিধায়কদের বা দলের ভিন্নমতাবলম্বীদের এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ডাকা হতো না। মানুষ আমাদের নির্বাচিত করে পাঠিয়েছেন, তাই এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে সরকারি স্তরে আলোচনা হওয়াটা একান্তই জরুরি।” সরকারি প্রকল্পের কাজ ও সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রতি তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই বৈঠক কেবল সরকারি কাজের রিভিউ মিটিং নয়, বরং তৃণমূলের অন্দরের অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণে আনার একটি কৌশলী পদক্ষেপ হতে পারে। বিশেষ করে দেব বা জুন মালিয়ার মতো জনপ্রিয় মুখদের এভাবে প্রশাসনিক মঞ্চে গুরুত্ব দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, বিজেপির পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে। বিরোধী শিবিরের একাংশ মনে করছে, তৃণমূলের বিদ্রোহী অংশকে কাছে টেনে নেওয়া বা উন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে নিয়ে চলার বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নিজের রাজনৈতিক জমি শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
বৈঠকের শেষে প্রশাসনিক আধিকারিকদের সাধারণ মানুষের কাছে পরিষেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রকল্পের বাস্তবায়ন যেন কোনোভাবেই থমকে না থাকে, তার জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক গণ্ডি পেরিয়ে কোলাঘাটের এই বৈঠক এখন রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়ে গেল।





