যে বাড়িটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও সানাইয়ের মিষ্টি সুর, আলোর রোশনাই, আত্মীয়-স্বজন ও অতিথিদের গমগমে ভিড় এবং এক আনন্দময় উৎসবে মুখরিত ছিল, চোখের পলকে সেই বাড়িতেই নেমে এল এক ঘন অন্ধকার ও বুক ফাটানো শোকের ছায়া। মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিনেই চিরকালের মতো চলে গেলেন জন্মদাতা পিতা। বিয়ের মণ্ডপে মেয়ের বিদায়কালীন আচার-অনুষ্ঠান চলার সময়ই হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন কনের বাবা। মহারাষ্ট্রের বুলধানা জেলার ভারদাদি গ্রামে ঘটে যাওয়া এই অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং হৃদয়বিদারক ঘটনাটি এখন পুরো এলাকায় গভীর শোকের আবহ তৈরি করেছে। মৃত ব্যক্তির নাম কুরুমদাস কুন্ডলিক ভুতেকর (৫০)।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কুরুমদাসের আদরের মেয়ে নন্দিনীর সঙ্গে জালনা জেলার মান্থা এলাকার বাসিন্দা প্রদীপ নানোতের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। সেই মতো গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারদাদি গ্রামে এক জমকালো এবং রাজকীয় বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং গ্রামবাসীদের উপস্থিতিতে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে বিয়ের মূল সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলি সম্পন্ন হয়। বর-কনে থেকে শুরু করে দুই পরিবারের সদস্যদের মুখে তখন শুধুই চওড়া হাসি। কিন্তু নিয়তির মনে যে অন্য এক ভয়ঙ্কর চিত্রনাট্য লেখা ছিল, তা কেউই টের পাননি।
বিয়ের মূল পর্ব এবং মন্ত্রোচ্চারণ শেষ হওয়ার পর তখন কনে বিদায়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছিল। নিয়ম অনুযায়ী, অত্যন্ত আবেগঘন মূহূর্তে পিতা কুরুমদাস যখন বরের পরিবারের হাতে তাঁর প্রিয় কন্যার হাতটি তুলে দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই হঠাৎ নিজের বুকে তীব্র ও অসহ্য ব্যথা অনুভব করেন তিনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিয়ের মণ্ডপের ভেতরেই সোফার ওপর জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েন তিনি। প্রথমটায় মণ্ডপে উপস্থিত লোকজন এবং আত্মীয়রা ভেবেছিলেন, টানা কয়েকদিনের খাটাখাটনি ও বিয়ের ধকলের কারণে অতিরিক্ত ক্লান্তিতে হয়তো তিনি সাময়িকভাবে অচেতন হয়ে পড়েছেন। কনের পরিবারের সদস্যরা এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মুখে-চোখে জল দিতে দিতে সাহায্যের জন্য ছুটে আসেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সময় নষ্ট না করে তাঁকে দ্রুত নিকটবর্তী একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মাঝপথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন কুরুমদাস। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। চিকিৎসকেরা জানান, তীব্র ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এই দুঃসংবাদটি বিয়েবাড়িতে পৌঁছানো মাত্রই আনন্দের উৎসব মুহূর্তের মধ্যে এক অবর্ণনীয় শোকে পরিণত হলো। কিছুক্ষণ আগেও যে বর-কনে এবং তাঁদের পরিবারবর্গ হাসিমুখে উৎসবে মগ্ন ছিলেন, তাঁরা এই আকস্মিক বজ্রপাতে সম্পূর্ণ স্তব্ধ ও হতবাক হয়ে যান। কনের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস।
মৃতের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা গেছে, কুরুমদাস ভুতেকর বেশ কিছুদিন ধরেই মারাত্মক হৃদরোগের সমস্যায় ভুগছিলেন। গত ডিসেম্বর মাসেই তাঁর একটি বড় বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা তাঁকে সব রকমের অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা এবং শারীরিক ক্লান্তি এড়িয়ে চলার কঠোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ের বিয়ে দেওয়াটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং শেষ স্বপ্ন। সেই কারণেই নিজের শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করেই মেয়ের বিয়ের সমস্ত তদারকি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করছিলেন তিনি।
এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর দ্রুত পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে গ্রামজুড়ে নেমে আসে স্তব্ধতা। যে বাড়ি থেকে ধুমধাম করে নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে মেয়ের বিদায় হওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িটিতেই এখন অভাগা বাবার শেষ যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করতে হয়। এই দৃশ্য দেখে গ্রামবাসীদের চোখ জাজ্বল্যমান জলে ভরে ওঠে। ভারদাদি গ্রামের সরপঞ্চ রবীন্দ্র নাগারে অত্যন্ত দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং কালান্তক ঘটনা। মেয়েকে বিদায় জানানোর সময় একজন বাবা এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর দুর্বল হৃদয় সেই আবেগ ও বিদায়ের মানসিক আঘাত সহ্য করতে পারেনি। এই ঘটনাটি একটি হাসিখুশি বিয়ের আনন্দকে এক গভীর ও চিরস্থায়ী শোকে পরিণত করে দিল।”





