তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ‘অপারেশন লোটাস’-এর ঘূর্ণি যেন থামার নামই নিচ্ছে না। রাজ্য বিধানসভার গণ্ডি পেরিয়ে সেই বিদ্রোহ এখন আছড়ে পড়েছে জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। সোমবার লোকসভার ২৮ জন তৃণমূল সাংসদের মধ্যে ২০ জন স্পিকার ওম বিড়লার কাছে লিখিত আবেদন জানিয়ে এনডিএ (NDA) জোটে শামিল হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝে সবথেকে বড় চমক হিসেবে উঠে এসেছে যাদবপুরের তারকা সাংসদ সায়নী ঘোষের নাম। তৃণমূলের ‘আসল’ নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া বিদ্রোহী শিবিরের এই নতুন সেনাপতি এখন ঘাসফুল শিবিরের দুশ্চিন্তার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
রাজনৈতিক মহলে সায়নী ঘোষের এই ভোলবদলকে এক অভাবনীয় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র সমালোচক থেকে শুরু করে নেত্রীর ‘রেপ্লিকা’ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা সায়নী, গত কয়েক বছরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তে জায়গা করে নিয়েছিলেন। যাদবপুরের মতো হাই-প্রোফাইল কেন্দ্র জয়ের পর তাঁর ওপর দলের আস্থা ছিল অপরিসীম। কিন্তু অতীতের নানা বিতর্কিত কাণ্ডে দলের ঢাল হয়ে থাকা সেই সায়নীই এখন দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বিশেষত ভূপেন্দ্র যাদবের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উপস্থিত থেকে সবাইকে চমকে দিয়েছেন।
সোমবারের ঘটনাক্রম ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। দিল্লির বুকে বিদ্রোহী সাংসদদের দীর্ঘ বৈঠকের পরেই স্পিকারের দপ্তরে এনডিএ-তে যোগদানের চিঠি পৌঁছায়। এর ফলে সংসদের নিম্নকক্ষে তৃণমূলের সংসদীয় দলের নিয়ন্ত্রণ কার্যত বিদ্রোহী শিবিরের হাতে চলে গেছে। মমতা-অভিষেকের সিদ্ধান্তকে সরাসরি উপেক্ষা করে এই বিদ্রোহী ব্লক এখন নিজেদেরই ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে।
নাটকের এখানেই শেষ নয়। সোমবার রাতে বীরভূমের প্রবীণ সাংসদ শতাব্দী রায়ের দিল্লির বাসভবনে ফের একপ্রস্থ রুদ্ধদ্বার বৈঠক বসে। সেই বৈঠকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতি নতুন করে জল্পনার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। লোকসভার পর এবার কি রাজ্যসভাতেও ‘অপারেশন লোটাস’ সফল করার নীল নকশা তৈরি হচ্ছে? যদিও বিদ্রোহী শিবিরের সাংসদদের দাবি, এটি নিছক একটি ‘সান্ধ্য চা-চক্র’ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা একে সাজানো রাজনৈতিক ছক বলেই মনে করছেন।
দলবদলুদের তালিকায় সায়নী ঘোষের নাম যুক্ত হওয়ার অর্থ, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব কেবল সাংগঠনিকভাবেই নয়, বরং সাংসদদের একাংশকে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও চরম ব্যর্থতার মুখোমুখি। সায়নী বা শতাব্দীর মতো হেভিওয়েটরা যদি সত্যিই এনডিএ-র দিকে ঝুঁকে পড়েন, তবে ঘাসফুল শিবিরের ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার বিষয়, কালীঘাট বা ক্যামাক স্ট্রিটের নেতৃত্ব এই ভাঙন রুখতে কী রণকৌশল অবলম্বন করে। বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন এবং অস্থির অধ্যায়ের সূচনা হলো কি? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে পরবর্তী কয়েকদিনের সংসদীয় সমীকরণে।





